Nature and Content

 



আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রকৃতি ও বিষয়বস্তু | Nature and Content of International Relations



■ প্রশ্ন:- পৃথক আলোচ্য বিষয় হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রকৃতি পর্যালোচনা করো। অথবা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রকৃতি ও বিষয়বস্তু আলোচনা করো। (Nature and Content of International Relations).


■ উত্তর:- রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস এই দুটি সামাজিক বিজ্ঞান থেকে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ এই নতুন সামাজিক বিজ্ঞানটির সৃষ্টি হয়েছে। এই কারণে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনা করা হয়ে থাকে। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আধুনিককালের সভ্য সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ক্রমবর্ধমান। 


এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন একটি সামাজিক বিজ্ঞানের। এর নাম হল ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’। সাধারণত সরকারের উদ্যোগ-আয়োজনের মাধ্যমে গড়ে উঠা রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কই হল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনা সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ-আয়োজনের মাধ্যমে গড়ে উঠা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের মধ্যে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা ইতিহাসের মত ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিককালে স্বতন্ত্র একটি সামাজিক বিজ্ঞান হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের ন্যায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কও হল একটি গতিশীল বিষয়। মানুষের সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনার পরিধিও পরিমার্জিত ও পরিবর্তিত হয়েছে। তার ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণারও বিবর্তন ঘটেছে। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন সংজ্ঞার সৃষ্টি হয়েছে। চিন্তাবিদরা যে যার দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচ্য বিষয়ের সংজ্ঞা দিয়েছেন । 


অনেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অর্থে ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতি’ (International Politics) শিরোনামটি প্রয়োগের পক্ষপাতী। অনেকে আবার বিশ্বরাজনীতি (World Politics) কথাটির ব্যবহার করার ব্যাপারে অধিকতর আগ্রহী। অনেকে আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে রাষ্ট্রসমূহের সম্পর্ক বিষয়ক আলোচনা হিসাবে প্রতিপন্ন করার পক্ষপাতী। হম্যান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত সংজ্ঞাসমূহের সীমাবদ্ধতার বিষয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতানুসারে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক ধারণা সম্পর্কে বিভ্রান্তি বর্তমান। একটি স্বতন্ত্র সামাজিক বিজ্ঞান হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচ্য বিষয়াদি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ভাবে অভিব্যক্তি লাভ করেনি। 


স্বভাবতই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে ব্যাপক মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সংজ্ঞাসমূহের সীমাবদ্ধতার কথা বলে হক্‌ম্যান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে নিজের ধারণার কথা বলেছেন। তাঁর মতানুসারে রাষ্ট্রের শক্তি ও বাহ্যিক নীতিকে প্রভাবিত করে এমন সব ক্রিয়াকর্ম ও উপাদানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংযুক্ত। অর্থাৎ এই দুনিয়া বিভিন্ন মূল এককে বিভক্ত । বিভিন্ন বিষয় ও কার্যকলাপ এই সমস্ত এককের শক্তি ও বাহ্যিক নীতিকে প্রভাবিত করে। এদের নিয়েই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনা। পামার ও পারকিস এই দুই চিন্তাবিদদের অভিমত অনুযায়ী রাজনীতিক এবং অ-রাজনীতিক বিষয়াদি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। 


আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনা হল বিশ্ব-সমাজের সকল মানুষ ও গোষ্ঠীসমূহের যাবতীয় সম্পর্কের আলোচনা এবং সেই সমস্ত শক্তি, চাপ ও প্রক্রিয়ার আলোচনা যা মানুষের জীবনধারা, ধ্যান-ধারণা ও ক্রিয়াকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। পামার ও পারকিনসের অভিমত অনুসারে, বিশ্ব-জনসম্প্রদায়ের মত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনা পরিবর্তনশীল। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং বিশেষভাবে জটিল প্রকৃতির। এ রকম পরিস্থিতি-পরিমণ্ডলের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনা শুধুমাত্র জাতি-রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সম্পর্ক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও গোষ্ঠীসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিককালে বিভিন্ন পর্যায়ের এবং পরিবর্তনশীল বহুবিধ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সমস্ত সম্পর্ক কখনও জাতি-রাষ্ট্রের স্তরের উপরের আবার কখনও নিচে। 


তবে মূল বিষয় হল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। আন্তর্জাতিক বিষয়াদি সম্পর্কিত সমস্যাদির আলোচনার ব্যাপারে আধুনিককালের চিন্তাবিদ্রা বিভিন্ন সামাজিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি, উপায়-পদ্ধতি, প্রযুক্তি প্রভৃতি প্রয়োগ করেছেন। তারফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনা ক্ষেত্রের পরিধি ও দৃষ্টিভঙ্গী ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। কুইন্‌সি রাইট -এর অভিমত অনুসারে আলোচনার বিষয় হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আইনমূলক কোন কাঠামোর মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয় না। এতদ্‌সত্ত্বেও কোন বিশেষ রাষ্ট্র সার্বভৌম কিনা, কোন সময়ে আইনমূলক কাঠামোই তা নির্ধারণ করতে পারে। রাইটের মতানুসারে সুস্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে অনিশ্চিত সার্বভৌমত্ব সম্পন্ন বিভিন্ন রাষ্ট্র বা সভার সম্পর্ককে বোঝায়। 


হাউসটন -এর অভিমত অনুযায়ী মানবগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ ও ভাবধারা বর্তমান থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে এগুলি সংযুক্ত। এই সমস্ত মতাদর্শ ও ভাবধারার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মানবগোষ্ঠীসমূহের আনুগত্য বোধ নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারণা অনুযায়ী ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ বহু বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়গুলি হল কূটনীতিকদের আসা-যাওয়া, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, চুক্তি-সন্ধি সম্পাদন , বৈদেশিক বাণিজ্যের বিস্তার, সামরিক বাহিনীর সংগঠন প্রভৃতি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হল এক ব্যাপক আলোচ্য বিষয়। এই আলোচ্য বিষয় গড়ে উঠে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বহুমুখী বিষয়াদির ভিত্তিতে। সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত হয় গুরুত্বপূর্ণ বহু ও বিভিন্ন বিষয়। এই সমস্ত বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া, রাজনীতিক ক্ষমতা ও মতাদর্শ, আন্তর্জাতিক সংগঠন, অ-রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা সংগঠন, জাতিসত্তা, স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী, জোট গঠন, নিরস্ত্রীকরণ, যুদ্ধ ও শান্তি প্রভৃতি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত সকলে নির্ভরশীলতার দ্বারা পরিচালিত হয়। এই নির্ভরশীলতার কারণেই রাষ্ট্রীয় বা অ-রাষ্ট্রীয় সংগঠনসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক সমাজের এককসমূহ পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণের তাগিদেই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। 


এই অনুভব থেকেই তারা পরস্পরের সান্নিধ্যে আসে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে আগ্রহী ও আন্তরিক হয়। আধুনিককালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সমাজবিজ্ঞানের নতুন একটি শাখা হিসাবে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। পৃথক একটি সামাজিক বিজ্ঞান হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বীকৃতি পেয়েছে। অধুনা এই বিষয়টিতে আলোচনা, গবেষণা, পঠন-পাঠন বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পৃথক বিষয় হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা-অনুশীলন আজকের বিষয় নয়। প্রাচীনকালেও আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রের শাসক কর্তৃপক্ষের সমস্যাদি, কূটনীতি প্রভৃতি বিষয়াদি নিয়ে আগেও লেখালেখি হয়েছে।

Previous Post Next Post